
দেওয়ান সামছুর রহমান
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক সমাজ। তাঁরাই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, সমাজকে আলোকিত করেন, রাষ্ট্রকে মানবসম্পদে রূপ দেন। কিন্তু এই শিক্ষক সমাজই আজ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বৈষম্য ও আর্থিক অনিরাপত্তার শিকার। সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলন তাই কেবল কিছু আর্থিক দাবিদাওয়া নয়, বরং এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর সংকট ও বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্র আজ এক ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, স্মার্ট শিক্ষা—এসব উদ্যোগের পেছনে যাঁরা মূল চালিকা শক্তি, সেই শিক্ষক সমাজই এখন সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার। দীর্ঘদিনের অবহেলা, বৈষম্য ও আর্থিক অনিরাপত্তা আজ শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলন শুধু কিছু বাড়ি ভাড়া বা চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির দাবি নয়; এটি শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও বেঁচে থাকার লড়াই।
দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বহু বছর ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। একজন শিক্ষক তাঁর চাকরি জীবন শুরু করেন মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেতনে। বর্তমান বাজারে যেখানে নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে এই বেতনে একজন শিক্ষকের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।
শুধু তাই নয়, বাড়িভাড়া মাত্র ১ হাজার টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা—যা বর্তমান যুগে বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই কারণেই শিক্ষক সমাজের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও ন্যায্য।
দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি জানানো হলেও সরকার কর্ণপাত করেনি। বরং নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই সারা দেশের শিক্ষক সমাজ আন্দোলনে নেমেছে।
গত ১২ অক্টোবর ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় বেসরকারি শিক্ষক সমাজের এক বিশাল সমাবেশ। সেখানে তাঁরা তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো তুলে ধরেন
_বাড়ি ভাড়া ২০% করা,
_ চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি,
_ কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫% করা,
_ অবসর ও কল্যাণ তহবিলে সরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি,
_ এবং সর্বোপরি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত অমানবিক। শিক্ষক সমাবেশে জলকামান ও টিয়ারশেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। একজন শিক্ষক যখন রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ন্যায্য অধিকার দাবি করেন, তখন তাঁর উত্তর যদি হয় দমননীতি—তাহলে তা গোটা জাতির বিবেকের জন্যই অপমানজনক।
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। কিন্তু যারা সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছেন, তাঁদের জীবন যদি অনিশ্চয়তায় ভরে যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই হবে?
একজন শিক্ষক দিনের পর দিন ক্লাস নিয়ে, শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলে, শেষ পর্যন্ত মাস শেষে হাতে পান এমন এক বেতন যা দিয়ে সংসারের অর্ধেক চাহিদাও পূরণ হয় না। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষকরা নবম পে-স্কেল অনুযায়ী বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা পাচ্ছেন। এই বৈষম্য শুধু আর্থিক নয়—এটি মর্যাদা ও নৈতিক স্বীকৃতিরও প্রশ্ন।
জাতীয় বাজেটে প্রতি বছর শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেই সুবিধা শিক্ষকদের জীবনে খুব একটা প্রতিফলিত হয় না। স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও, যাঁরা সেই স্কুলে পাঠদান করেন তাঁদের জীবনের মান অপরিবর্তিত থেকে যায়।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষকদের পক্ষে ব্যাপক সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো—যেখানে শিক্ষকরা জলকামানে ভিজে যাচ্ছেন বা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাবি জানাচ্ছেন—তা দেশের মানুষের বিবেক নাড়া দিয়েছে।
মানুষ বুঝতে পারছে, এটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটি একটি পেশাজীবী শ্রেণির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। শিক্ষকদের প্রতি এই সহানুভূতি আসলে রাষ্ট্রের প্রতি এক সতর্ক বার্তাও—শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার এখনই সময়।
আসলে মূল সংকট গুলো হলো:
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বেতনভাতা বৈষম্য।
অবসর ভাতা, কল্যাণ তহবিল ও চিকিৎসা সহায়তায় সীমাবদ্ধতা।
প্রশাসনিক ধীরগতি ও রাজনৈতিক প্রভাব।
শিক্ষক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তার অভাব।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি বা স্মার্ট এডুকেশন বাস্তবায়ন কল্পনাও করা যায় না।
এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাড়িভাড়া ২০ শতাংশ এবং চিকিৎসা ভাতা সময়োপযোগী হারে বৃদ্ধি করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫% নির্ধারণ করা উচিত।
চতুর্থত, অবসর ও কল্যাণ তহবিলে সরকারি অনুদান বৃদ্ধি করে শিক্ষক সমাজকে নিরাপত্তা দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধাপে ধাপে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের রোডম্যাপ তৈরি করা।এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যেন যোগ্য শিক্ষকরা প্রাপ্য মর্যাদা পান।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জাতি গঠনের ভিত্তি হলো শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার প্রাণ হলো শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
সরকারকে বুঝতে হবে—এই আন্দোলন রাষ্ট্রবিরোধী নয়; এটি একটি পেশাগত মর্যাদার দাবি।
সরকারের এই বৈষম্যমূলক আচরণ ও শিক্ষক সমাবেশে নিপীড়নের প্রতিবাদ ও ৩ দফা দাবী নিয়ে ১৩ অক্টোবর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি এবং সারাদেশের বেসরকারি এমপিওভূক্ত স্কুলে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি চলছে। দাবী আদায়ে প্রজ্ঞাপন জারীর আগ পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলমান থাকবে।
আজ যদি শিক্ষকদের দাবি শোনা না হয়, তবে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়বে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। আর যদি এখনই সরকার আন্তরিকভাবে সংলাপে বসে