
প্রতিদিনের নারায়ণগঞ্জ ডেস্ক
সমুদ্রের তলদেশে যখন বেশিরভাগ মানুষ শুধু রঙিন মাছ আর প্রবালের সৌন্দর্য খোঁজে, তখন বারো বছরের থারাগাই আরাথানা খোঁজে প্লাস্টিকের স্তূপ আর পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল। পাঁচ বছর বয়সে স্কুবা ডাইভিং শুরু করা এই কিশোরী আজ “ওশানস লিটল গার্ল” নামে পরিচিত। ইতিমধ্যেই ১০০-র বেশি ডাইভ সম্পন্ন করে সে সমুদ্র থেকে সরাতে সাহায্য করেছে ৭ হাজার কিলোগ্রামেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য। একটি ডুগংয়ের মৃত্যু দেখার পর থেকেই সমুদ্রকে বাঁচানোর লড়াই যেন তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
বারো বছরের একটি মেয়ে। হাতে নেই কোনও বড় পদক, নেই আলো ঝলমলে মঞ্চ। অথচ সমুদ্রের তলদেশে নেমে সে যা করছে, তা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও কল্পনা করতে পারে না। থারাগাই আরাথানা এখন পরিচিত “ওশানস লিটল গার্ল” নামে। বয়স মাত্র ১২ বছর, কিন্তু ইতিমধ্যেই ১০০-র বেশি স্কুবা ডাইভ সম্পন্ন করেছে সে। সমুদ্রের বুক থেকে সরাতে সাহায্য করেছে ৭ হাজার কিলোগ্রামেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল। ছোট্ট এই মেয়ের কাছে সমুদ্র শুধু নীল জলের বিস্তার নয়, অসংখ্য প্রাণের ঘর।
চেন্নাইয়ের বাসিন্দা থারাগাইয়ের জলের সঙ্গে পরিচয় খুব ছোটবেলায়। তার বাবা এস বি অরবিন্দ থারুনশ্রী একজন পেশাদার স্কুবা ডাইভার ও প্রশিক্ষক। বাবার হাত ধরেই মাত্র ৫ বছর বয়সে স্কুবা ডাইভিং শেখা শুরু করে সে। প্রথম দিকে সমুদ্রের রঙিন মাছ, প্রবাল আর জলের নিচের বিস্ময় তাকে টানত। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই বিস্ময়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ সত্য চোখে পড়ে। সমুদ্রের তলায় ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক, বোতল, প্যাকেট আর ছিঁড়ে যাওয়া মাছ ধরার জাল। আরও বড় আঘাত আসে, যখন একটি ডুগং বা সি কাউকে জালে আটকে মারা যেতে দেখে থারাগাই। সেই দৃশ্য তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
তারপর থেকেই বদলে যায় থারাগাইয়ের লক্ষ্য। ৭ থেকে ৮ বছর বয়সের মধ্যেই সে বাবার সঙ্গে সমুদ্র পরিষ্কারের কাজে নামতে শুরু করে। ডুব দিয়ে প্লাস্টিক, পরিত্যক্ত জাল আর নানা ধরনের বর্জ্য তুলে আনতে থাকে। ২০২২ সালে, মাত্র ৮ বছর বয়সে, প্রায় ৬০০ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য সরানোর কাজে অংশ নিয়ে সে প্রথমবার জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসে। সেই সময় থেকেই তাকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে।
বছরের পর বছর ধরে থেমে থাকেনি এই কাজ। থারাগাইয়ের অভিজ্ঞতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে তার সংগ্রহ করা বর্জ্যের পরিমাণও। বর্তমানে সে ৭ হাজার কিলোগ্রামেরও বেশি প্লাস্টিক এবং “ঘোস্ট নেট” নামে পরিচিত পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল সমুদ্র থেকে সরাতে সাহায্য করেছে। এই জালগুলিই বহু সময় কচ্ছপ, ডুগং এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই থারাগাইয়ের কাছে প্রতিটি ডাইভ শুধু একটি অভিযান নয়, সমুদ্রের প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।
সমুদ্র সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে থারাগাই অন্য পথও বেছে নিয়েছে। সে পানির নিচে ভারতনাট্যম পরিবেশন করেছে, যা বিশেষভাবে সাড়া ফেলেছে। আবার দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতার কেটেও মানুষের নজর কাড়েছে। স্কুল, কলেজ এবং নানা অনুষ্ঠানে গিয়ে সে প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষতি ও সমুদ্র দূষণ নিয়ে কথা বলে। এত অল্প বয়সে তার এই দায়িত্ববোধ অনেককেই অবাক করে দেয়। কারণ থারাগাইয়ের কাছে সমুদ্র কোনও দূরের জায়গা নয়। সমুদ্র তার বন্ধু, তার ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই প্রতিবার অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে নিয়ে নীল জলের গভীরে নেমে পড়ে এই বারো বছরের বালিকা।